
গত ১৩ অক্টোবর যুক্তরাজ্যের একটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) সাম্প্রতিক এক তদন্তে দেখা গেছে, বিশ্বজুড়ে হাসপাতালগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণের হার দ্রুত বেড়েই চলেছে। আগে যেসব সাধারণ সংক্রমণ সহজেই অ্যান্টিবায়োটিক দ্বারা নিয়ন্ত্রণ করা যেত, এখন সেগুলোও চিকিৎসার জন্য জটিল হয়ে উঠছে। চিকিৎসকরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন, সামনের দিনগুলোতে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ বৃদ্ধির ফলে সাধারণ সংক্রমণের চিকিৎসায় গুরুতর সমস্যা দেখা দিতে পারে।
২০২৩ সালের জরিপ অনুযায়ী, পরীক্ষাগারে ধরা ছয়টির মধ্যে অন্তত একটি সংক্রমণ প্রচলিত অ্যান্টিবায়োটিকে প্রতিরোধ করছে। রক্ত, মূত্রনালি, অন্ত্র ও যৌন সংক্রমণসহ সাধারণ সংক্রমণের প্রায় ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কার্যকারিতা হারাচ্ছে। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, ২০৫০ সালের মধ্যে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে।
২০১৭ সালে WHO জানিয়েছিল, কার্যকর অ্যান্টিবায়োটিক দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে এবং নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারের গতি অত্যন্ত ধীর। বর্তমান বাজারে থাকা বেশির ভাগ অ্যান্টিবায়োটিক এখন অকার্যকর। রোগজীবাণুর প্রতিরোধ ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে নতুন ওষুধ উদ্ভাবনের গতি তেমন নেই, যা ভবিষ্যতে সংক্রমণ মোকাবিলাকে কঠিন করে তুলবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণ শুধুমাত্র চিকিৎসা ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ নয়। অতি ছোট সার্জারি থেকে শুরু করে দৈনন্দিন চিকিৎসা ও রোগ নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রেও এর প্রভাব পড়ছে। বাজারে থাকা অ্যান্টিবায়োটিকের বেশির ভাগই পুরনো ওষুধের সংক্ষিপ্ত সংস্করণ, যা দীর্ঘমেয়াদী সমাধানে কার্যকর নয়।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানিয়েছে, নতুন সংক্রমণ প্রতিরোধী ওষুধ আবিষ্কারে যথেষ্ট অর্থায়ন করা না হলে মানবসভ্যতা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়বে। বর্তমানে ৫১টি পরীক্ষাধীন অ্যান্টিবায়োটিকের মধ্যে মাত্র আটটি কার্যকর হতে পারে। মাল্টিড্রাগ রেজিস্ট্যান্ট যক্ষ্মা ও অন্যান্য গুরুতর সংক্রমণে চিকিৎসকের হাতে কার্যকর অপশন কম।
বিশ্বের বিভিন্ন হাসপাতাল ও নার্সিং হোমে অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণ মৃত্যুর কারণ হয়ে উঠছে। ওষুধ কোম্পানি ও গবেষকরা নতুন অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কারে তৎপর হলেও, অর্থনৈতিক কারণে আগ্রহ সীমিত। অ্যান্টিবায়োটিক উদ্ভাবনে প্রয়োজন হয় কোটি কোটি ডলারের বিনিয়োগ, কিন্তু সংক্ষিপ্ত ব্যবহারের কারণে লাভমুখী হওয়া কঠিন।
বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষ এখনও এই সংকট সম্পর্কে পর্যাপ্ত সচেতন নয়। যেমনটা অতীতে মনে করা হতো, চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা নতুন ওষুধ আবিষ্কারে এগিয়ে আসবেন, বাস্তবে পরিস্থিতি ভিন্ন। অ্যান্টিবায়োটিক-প্রতিরোধী সংক্রমণ মানব সভ্যতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে, যা ধনী, গরিব, শিশু বা বৃদ্ধ—সবার জন্য হুমকিস্বরূপ।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রতিরোধের সঙ্গে সঙ্গে অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। শুধু মানুষ নয়, পশু ও কৃষিক্ষেত্রেও অ্যান্টিবায়োটিকের যুক্তিসংগত ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি।
ড. মুনীরউদ্দিন আহমদ অধ্যাপক, সাবেক ডিন, ফার্মেসি অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বর্তমানে অধ্যাপক, ফার্মেসি বিভাগ, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
মন্তব্য করুন