
গাজায় টানা বৃষ্টিপাত ও দমকা হাওয়ার আঘাতে বহু অস্থায়ী শিবির ভেঙে পড়েছে। অনেক এলাকায় রাস্তাঘাট নদীর মতো হয়ে গেছে, তাঁবুর ভেতর ঢুকে পড়েছে শীতল পানি। পরিবারগুলো কাদামাখা মেঝেতে রাত কাটাতে বাধ্য হচ্ছে।
কঠোর শীত শুরু হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে আসা এই ঝড় উপত্যকার প্রায় ২০ লাখ মানুষের জন্য নতুন দুর্ভোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে ইসরায়েলের রাজনীতিতেও উত্তেজনা বাড়তে শুরু করেছে—প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার ভেতরেই সৃষ্টি হয়েছে মতবিরোধ।
গাজা সিটির এক শিবিরে ৩৮ বছর বয়সী সানা আবু হারাদ ক্ষতবিক্ষত তাঁবুর ভেতর দাঁড়িয়ে কান্না সংবরণ করতে পারছিলেন না। তার ভেজা বিছানা আর কাঁপতে থাকা ছোট শিশুটির দিকে তাকিয়ে তিনি বলেন,
“সবকিছু পানিতে তলিয়ে গেছে। এই শিশুকে কি বন্যার পানির ওপর ঘুমাতে হবে? এত কষ্টে একটা তাঁবু জোগাড় করেছিলাম। এখন বাঁচার মতো কোনো জায়গাই নেই। সন্তানদের নিয়ে কোথায় যাব?”
গত দুই বছরের ইসরায়েলি হামলায় পানি–পয়ঃনিষ্কাশনসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ভেঙে পড়ায় সংকট আরও গভীর হয়েছে। লক্ষাধিক মানুষ শৌচাগার বা সঠিক নিষ্কাশন ব্যবস্থা ছাড়া গাদাগাদি করে থাকতে বাধ্য হচ্ছে।
জাতিসংঘের অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) জানিয়েছে—গাজার ৯০% মানুষ বাস্তুচ্যুত, এবং ১৫ লাখেরও বেশি মানুষের জরুরি আশ্রয় সহায়তা প্রয়োজন।
গাজার সিভিল ডিফেন্সের মুখপাত্র মাহমুদ বাসাল বলেন—
“ভারী বৃষ্টিতে গোটা এলাকা চরম বিপর্যয়ের মুখে। পয়ঃনিষ্কাশন না থাকায় বর্জ্য ও বৃষ্টির পানি মিশে ভয়াবহ স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করছে।”
জাতিসংঘ অভিযোগ করেছে—শীতের পোশাক, কম্বল, পানীয় জল, স্যানিটেশন সরঞ্জামসহ ত্রাণ ঢুকতে ১০০–এরও বেশি অনুরোধ ইসরায়েল প্রত্যাখ্যান করেছে, যা মানবিক কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত করছে।
অন্যদিকে ইসরায়েলি সংস্থা COGAT দাবি করেছে, প্রতিদিন শত শত ট্রাক খাদ্য, পানি, ওষুধ ও আশ্রয় সামগ্রী নিয়ে গাজায় প্রবেশ করছে।
আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও উত্তেজনা
গাজায় আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী মোতায়েনের জন্য মার্কিন প্রস্তাব জাতিসংঘে ভোটে উঠছে। রাশিয়া, চীন ও কয়েকটি আরব দেশের বিরোধিতার মুখে এই প্রস্তাব নিয়ে উত্তেজনা তৈরি হয়েছে ইসরায়েলেও।
মার্কিন সমর্থিত যৌথ বিবৃতিতে ফিলিস্তিনের স্বশাসন ও ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করা হলে ইসরায়েলের অতিদক্ষিণপন্থী দুই মন্ত্রী নেতানিয়াহুকে প্রকাশ্যে চাপে রাখেন।
নেতানিয়াহু বলেন—
“ইসরায়েল কোনওভাবেই ফিলিস্তিনি রাষ্ট্র মেনে নেবে না—এ অবস্থান বদলায়নি।”
শিবিরে রাতের পর রাত—‘বৃষ্টি আর ঠান্ডা আমাদের মেরে ফেলছে’
গাজার বহু শিবিরে রাতভর বৃষ্টিতে ত্রাণের তাঁবুগুলো টিকে থাকতে পারছে না।
৫০ বছর বয়সী মা’ইন আলবুহতেইতি সাত সন্তান নিয়ে গাজায় একটি তাঁবুতে থাকেন। ভোর রাতে বৃষ্টি ঢুকে পড়লে তারা ঘুম থেকে লাফিয়ে ওঠেন।
তিনি বলেন—
“চারদিকে শুধু পানি। বিছানা, আসবাব—সব নষ্ট হয়ে গেছে। পুরো পরিবার আটকেপড়ে ছিলাম। যদি একটু ভালো আশ্রয় পেতাম, এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করা যেত।”
মানুষের মনে এখন একটাই প্রশ্ন—শীত যত গড়াচ্ছে, সামনে বেঁচে থাকার পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠবে।
মন্তব্য করুন